আবার যদি সাহিত্য নিয়ে বলি, তাহলে আমরা বলতে পারি, ‘মানুষ’ হয়ে ওঠার পেছনে সাহিত্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাহিত্য ব্যক্তির কল্পনা আর অনুভূতি নিয়ে কাজ করে। সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে আপনি অন্যের প্রতি অনুভূতিশীল হয়ে উঠতে পারেন এবং বিভিন্ন উপাদানের আন্তসম্পর্ক বুঝতে পারেন। সাহিত্য আপনার তুলনা করার যোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়, যুক্তিবোধ তৈরি করে এবং নতুন সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে।
বাংলা বিষয়ে কেন পড়াশোনা করবেন?
যোগাযোগ দক্ষতার জন্য ভাষা শিক্ষার বিকল্প নেই। সেটা যেকোন ভাষার জন্য প্রযোজ্য। শুধু ভাষা শিক্ষা নয় একজন ভালো মানুষ হওয়ার জন্য সাহিত্য শিক্ষার কোনো তুলনা নেই। সাহিত্য একজন মানুষকে বিকশিত মানুষ করে তোলে।
সাহিত্য মানুষের অনুভূতি ও কল্পনা নিয়ে কাজ করে। বাংলা বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করলে আপনি একজন ভাল বিতার্কিক হতে পারবেন ও যুক্তিনিষ্ঠ মানুষ হতে পারবেন। আপনার মধ্যে ভালো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা জন্মাবে।
কোথায় কোথায় পড়ানো হয় বাংলা :
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়ে যে কেউ পড়াশোনা করতে পারবে। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়ে পড়াশোনা করার ক্ষেত্রে বাংলা বিষয় পেতে হলে অবশ্যই কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়।
মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়টি পাওয়া যায়। তবে বিভাগ পরিবর্তন ইউনিট থেকে যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিয়ে বাংলা বিষয়টি ভালো মেধাতালিকায় থাকলে পাওয়া যায়।
বাংলা সাবজেক্টে যা শেখানো হয়:
বাংলা বিভাগগুলোর সিলেবাস মূলত সাহিত্যনির্ভর। এখানে প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। অন্যভাবে বলা যায়, বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিকের কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক ইত্যাদি পড়তে হয়। প্রাচীন যুগের চর্যাপদ–এর নাম হয়তো শুনেছেন, বাংলা বিভাগে ভর্তি হতে পারলে এবার এ সম্পর্কে বিস্তারিত পড়তে হবে। মধ্যযুগের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব কবিতা, শ্রীচৈতন্য, প্রণয় উপাখ্যান, মৈমনসিংহ গীতিকা, দোভাষী পুঁথি ইত্যাদি সম্পর্কে পড়তে হয়।
তাছাড়াও বাংলা গদ্যের বিকাশে আধুনিক যুগে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া থেকে শুরু করে হাল আমলের কোনো লেখকই বাদ যান না আলোচনায়। প্রাচীন ভারতীয় রসতত্ত্ব এবং আধুনিক বিদেশি সাহিত্যের কিছু অনুবাদও পড়ানো হয়।
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা বাংলা কবিতার অলংকার-ছন্দ নিয়ে পড়েন, বাংলা ভাষার ইতিহাস পড়েন, ব্যাকরণ পড়েন, সাহিত্যের রূপ-রীতি পড়েন। তাঁদেরকে পুরোনো পাণ্ডুলিপিবিদ্যা কিংবা আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের কিছু অংশ পড়তে হয়, শিখতে হয় সাহিত্য সমালোচনা ও গবেষণার পদ্ধতিও।
বাংলা সাবজেক্টের কোর্সসমূহ:
মূলত এই বিষয়গুলো বাংলায় অনার্স কোর্সে পড়ানো হয় থাকে:
- ব্যাকরণ
- বাংলা ভাষার ইতিহাস
- পাণ্ডুলিপিবিদ্যা
- আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের কিছু অংশ
- সাহিত্যের রূপ-রীতি
- সাহিত্য সমালোচনা ও গবেষণার পদ্ধতি
- আধুনিক যুগে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভূমিকা
- বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকদের ভূমিকা
- প্রাচীন ভারতীয় রসতত্ত্ব
- আধুনিক বিদেশি সাহিত্যের কিছু অনুবাদ
- বাংলা কবিতার অলংকার-ছন্দ
- সাহিত্য
- বিভিন্ন যুগ ( প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগ )
- সাহিত্যের বিভিন্ন শাখা সম্পর্কে ধারণা
- বাংলা কবিতা
- বাংলা গল্প
- বাংলা উপন্যাস
- বাংলা নাটক
- চর্যাপদ
- শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
- মঙ্গলকাব্য
- বৈষ্ণব কবিতা
- শ্রীচৈতন্য
- প্রণয় উপাখ্যান
- মৈমনসিংহ গীতিকা
- দোভাষী পুঁথি সহ আরও অনেক বিষয়ে রয়েছে বাংলার বিস্তার।
বাংলা সাবজেক্ট নিয়ে উচ্চশিক্ষা:
বাংলাদেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বাংলায় অর্নাস, মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করা যায়। ইউরোপ আমেরিকার কিছু বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যেখান থেকে বাংলায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা যায়। আপনারা হয়তো জেনে অবাক হবেন যে, অক্সফোর্ডের মত বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেয়া যায়। এছাড়াও ভারতসহ অন্যান্য কিছু দেশে এ বিষয়ের উপর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করার সুযোগ আছে।
$ads={1}
বাংলা বিষয়ের ক্যারিয়ার:
বাংলাদেশ বাংলা বিষয় হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় অবমুল্যায়িত হয়ে থাকে। তবে বাংলায় পড়েও কিন্তু অনেক ভাল ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। তবে সে জন্য একাগ্রতা ও চেষ্টা থাকতে হবে। সাথে ভাল ফলাফলের ও প্রয়োজন। বাংলা থেকে ক্যারিয়ার গড়া যায় এমন কিছু বিষয় নিচে তুলে ধরা হলো:
- বাংলাদেশে অনেক সরকারি/বেসরকারি প্রাইমারি স্কুল, হাই স্কুল ও কলেজ আছে এবং প্রায় ৩০(+/-) বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেখানে সরাসরি বাংলা বিভাগ আছে। আর এই গুলাতে আপনি চাইলে শিক্ষক হিশেবে ক্যারিয়ার গঠন করতে পারেন। তবে দেশে ১০৫+ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও এইগুলা আমার জানামতে বাংলা বিভাগ নাই বিধায় এখানে সুযোগ কম।
- শিক্ষকতা ছাড়া সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে আপনার ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ আছে। ওইসব প্রতিষ্ঠানে কোন সাব্জেক্টে পড়েছেন সেটা মূখ্য নয়, ওখানে প্রাধান্য পায় শুধু অনার্স এর ফলাফল । এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সবচেয়ে ট্রেন্ডিং জব বিসিএস দিয়ে ভালো পজিশন হোল্ড করতে পারবেন।
- বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে আপনি আপনার ক্যারিয়ার গঠন করতে পারবেন।
- আপনার লেখালেখির করার অভ্যাস থাকলে লেখক হিশেবে সাহিত্য জগতে অনুপ্রবেশ করতে পারেন৷
সর্বোপরি আপনি বাংলা পড়েছেন তাই বলে চাকরি করতে হবে এমন নয়, আপনি চাইলে ভালো উদ্দোক্তা বা বিজনেস ম্যান হতে পারেন। অনেকেই স্রোতের বিপরীতে গিয়ে অনেক ভালো করতেছে।
বাংলা সাবজেক্ট এর চাকরির বাজারের চাহিদা:
বাংলা পড়ার সুবিধা হলো, প্রায় সব ধরনের চাকরির সুযোগ খোলা থাকে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়—কোথায় নেই বাংলা! ফলে শিক্ষকতা করার বিশাল ক্ষেত্র পড়ে রয়েছে বাংলার শিক্ষার্থীদের জন্য। বাংলায় উচ্চতর গবেষণার সুযোগ থাকায় এর মাধ্যমে দ্রুত ক্যারিয়ারের ওপরের ধাপে পৌঁছানো যায়। বাংলায় পড়ে সরকারি আমলা হতে বাধা নেই। বিসিএস পরীক্ষায় বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা খুব ভালো করেন। বিভিন্ন ব্যাংক-বিমা-এনজিও কিংবা সরকারি-বেসরকারি চাকরির সুযোগ তো থাকছেই। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, আবৃত্তি, লেখালেখি, সম্পাদনা, ভাষা-প্রশিক্ষণ—এ ধরনের কাজ বেশ ভালোভাবেই বাংলার সঙ্গে যায়।
বাংলা সাবজেক্ট পড়ে বাংলাদেশে যত চাকরি:
বাংলাদেশে চাকরির ক্ষেত্রে সাবজেক্ট অনেক ক্ষেত্রেই গৌণ হয়ে যায়। তাই আপনি বাংলা সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা করেন বা অন্য কোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা করেন তথাপি বিশেষায়িত কিছু চাকরি ছাড়া বাকি সব চাকরিই করতে পারবেন।
$ads={2}
তবে সব চাকরি করতে পারলেও সে ক্ষেত্রে অনার্স মাস্টার্স এর ভাল ফলাফল দরকার হবে। তাই আপনি কোন সাবজেক্টে অনার্স করছেন সে দিকে চিন্তা না করে বরং আপনি আপনার সাবজেক্টে কতটা পারদর্শী হতে পারছেন সে দিকে লক্ষ রাখায় ভাল। সরকারি, বেসরকারি, ব্যাংক, বিসিএস প্রায় সব চাকরিতেই আপনি বাংলা সাবজেক্ট এ অনার্স, মাস্টার্স শেষ করে ঢুকতে পারবেন।
নিম্বে তেমন কিছু চাকরির নাম দেয়া হলো:
- বাংলাদেশ ব্যাংকের এডি
- গবেষক
- আন্তর্জাতিক সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা
- ব্যাংকে চাকরী
- এনজিওতে চাকরী
- মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকুরী
- বিসিএস দিয়ে ক্যাডার হওয়ার সুযোগ
- হাই স্কুলের শিক্ষক (সরকারি ও বেসরকারি)
- কলেজের শিক্ষক (সরকারি ও বেসরকারি)
- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক (পাবলিক ও প্রাইভেট)
- বিসিএস দিয়ে নন ক্যাডার জব করা
- সকল প্রকার সাধারণ সরকারি চাকুরী
- প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক (সরকারি ও বেসরকারি)
এছাড়াও আরও অনেক চাকরি রয়েছে যা বাংলা সাবজেক্ট এ অনার্স/মাস্টার্স করে যোগ দেয়া যায়।






একটি মন্তব্য পোস্ট করুন